ভূতেদের রোজনামচা

চন্দ্রমা মুখার্জী,

সমর পল্লী, কলকাতা

শৌভিক ঘরে বসে বসে রাতের বেলা ভূতের সিনেমা দেখছিল। ভালোই লাগছিল,হঠাৎ শোনে কে যেন ডাকছে,‘দাদুভাই, ও দাদুভাই। বলি, একা একা ভূতের বই দেখছো, এরপর ঘুমোবে কি করে?’ শৌভিক এদিক-ওদিক তাকিয়ে কাউকে দেখতে পেল না, কিন্তু গলাটা ওর চেনা। তিনমাস আগেই ওর দাদু মারা গেছেন,এতো পুরো ওর দাদুর গলা। তবে কি দাদু-----

‘দেখতে পাচ্ছো না তো, সামনের দেওয়ালের দিকে একদৃষ্টে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থাকো, তাহলেই দেখতে পাবে।‘ – ওমা,ঠিক তাই। ওই তো দাদু আবছা ভাবে ফুটে উঠেছেন,তবে দাদুর শরীরের ভিতর দিয়ে দেওয়ালটা দেখা যাচ্ছে।

শৌভিক কিন্তু একটুও ভয় পেল না,উল্টে তিনমাস পরে দাদুকে দেখে খুব খুশি হল, বলল,‘কেমন আছো দাদু? ঠাম্মার দেখা পেলে?’ দাদু বললেন,‘হ্যাঁ, সেই বলতেই তো এলাম। তোর ঠাম্মা জানিস, মরে গিয়েও সেই আগের মতোই আছে। সেই আমার ওপর রাগ,বকাবকি সব আছে।‘

‘ছেলেটার কাছে এসে সেই বাজে বকছো তো?’ – ঠাম্মাও হাজির। ‘জানিস দাদুভাই, চারবছর বেশ শান্তিতে ছিলাম। এখানে বুড়িদের দলে ভালোই দিন কাটছিল। তিনমাস আগে হঠাৎ তোর দাদু এসে হাড় আমার জ্বালিয়ে দিল। নিত্যি ঝগড়া লাগছে। আমার একটা কথাও শোনে না বুড়ো। কেন,নিজের খেয়াল রাখতে হবে না? বয়স তো কম হল না।‘

‘সে কি গো ঠাম্মা, ভূতেদের আবার বয়স হয় নাকি, আর খেয়াল রাখারই বা কি আছে?’ – শৌভিক অবাক হয়ে বলল। ‘হুঁ হুঁ বাবা,সব হয়। তুই ওসব সিনেমা দেখে,বই পড়ে যা শিখেছিস সব ভুল, বুঝলি?’ – দাদু বললেন।

‘তুই ভূত কিরকম হয় ভাবছিস? মুলোর মতো দাঁত,কুলোর মতো কান,কঙ্কালের মতো দেখতে নাকি? না রে, ওসব কল্পকথা। আমাদের যেমন দেখছিস এরকমই দেখতে। আমাদেরও এখানে রোজকার জীবন আছে। রান্না করো, খাও-দাও, গানবাজনা করো, ঘুমোও। হ্যাঁ,তবে স্কুল-কলেজ,অফিসের বালাই নেই।‘ – দাদু বললেন।

‘তাহলে টাকাপয়সা?’ – শৌভিক বলল। ‘ও দাদুভাই,ওসবের ব্যাপার নেই। আসলে আমাদের কোন কিছু ফুরোয় না, তাই বাজার করতেও হয় না। তবে রান্না করতে হয়। আর এটাই আমাদের জীবন। এর কোন শেষ নেই। জীবনও ফুরোয় না ভূতেদের।‘ – ঠাম্মা বললেন।

‘আচ্ছা, তোমরা নাকি সুরে কথা বলো না?; - শৌভিক অবাক। ‘না গো,না ওসব বানানো কথা। আমরা এখানে সুখেই আছি। আসি গো। ভালো থেকো।‘ – বলে দাদু – ঠাম্মা চলে গেলেন।

‘কি রে বাবু ওঠ্‌, সিনেমা দেখতে দেখতে ঘুমিয়ে পড়েছিস? সকাল হয়ে গেল তো। অফিস যাবি না?’ – মায়ের ডাকে চোখ মেলে শৌভিক তাকিয়ে দেখল, সকাল হয়ে গেছে। ও অবাক হয়ে ভাবতে লাগল, দাদু – ঠাম্মা কি সত্যিই এসেছিলেন নাকি ওর স্বপ্ন। তারপরেই দেখলো, খাটের ধারে দাদুর চশমা আর ঠাম্মার একটা চুড়ি পড়ে আছে। ওগুলো তুলে নিয়ে মাকে দেখিয়ে বলল কাল রাতের কথা। মাও শুনে অবাক হয়ে গেলেন। আলমারিতে থাকা জিনিস ওখানে পড়ে আছে দেখে উনিও পুরো ঘটনাটা বিশ্বাস করলেন আর ওঁনাদের উদ্দেশ্যে প্রণাম জানালেন।