বসন্তের আগুন কি গ্রাস করবে মানুষের লোভের আগুন?
গৌরাঙ্গ বন্দ্যোপাধ্যায়,
হাওড়া
বেলুড় স্টেশনে নেমে ভাঙাচোরা বাম্পার সম্মৃদ্ধ পথে টোটো বাহনে চলেছি
বেলুড় ESI হাসপাতালের পাশের ভূখণ্ডস্থিস্ত পলাশ বনে। সঙ্গী দেবপ্রিয়
প্রামানিকের নেতৃত্বে 'ভালোবাসা এক্সপ্রেস' এর বিভিন্ন সদস্যবৃন্দ। যাবার
পথে চোখে পড়লো ভিখারি মায়ের সংসার। ক্ষুধায় কাতর শিশুর তারস্বরে চিৎকার।
আর মনের মধ্যে ছায়া ফেললো বেলুড় স্টেশনে সবাই একত্র হবার আগে হাতে ধরা
কাগজের বিভিন্ন পাতার হেডলাইন। ফলতঃ মনের মধ্যে ভেসে উঠলো কয়েকটা কবিতার
লাইন। সূর্যের উজ্জ্বল রোদে শেষ ফেব্রুয়ারির এই সকাল উদ্ভাসিত। দূর থেকে
চোখে এলো আগুনের মতো উজ্জ্বল পলাশ বন। যেন কোথাও কোনো আয়োজনের কমতি নেই
প্রকৃতির তরফ থেকে। কিন্তু আমরা - এই সবজান্তা মানবকুল কি সত্যিই
প্রকৃতির এই প্রসাদ পাবার যোগ্য করে তুলতে পেরেছি নিজেদের? যদি পারতাম
তাহলে কবিতা এভাবে ধরা দিত না আমার কলমে।
আগুন, আগুন, আগুন লেগেছে, আগুন -
বসন্তের মোহিনী মায়ায় আগুন লেগেছে শিমুল-পলাশের বনে বনে,
আগুন লেগেছে গ্রামবাংলার মাঠে ঘাটে, শহরে, প্রান্তরে, গলিতে, রাজপথে।
আগুন লেগেছে মহাকুম্ভের পবিত্র ভূমিতে,
আগুন লেগেছে ইউক্রেনের গমের ঝুড়িতে,
আগুন লেগেছে প্যালেস্টাইনের গাজার সংঘর্ষভূমিতে।
আবার আগুন লেগেছে ক্যালিফোর্নিয়ার জঙ্গলে, জঙ্গলে,
আগুন লেগেছে এই বিশ্বজগতের প্রতিটি কোণে,
আর আগুন লেগেছে গোটা বিশ্বের ভুখা মানুষের পেটে।
ভিসুভিয়াসের আগুন জ্বলছে ধানমন্ডির গেটে।
আগুন জ্বলছে মহাপুরুষের বাণীতে, স্মৃতিতে, প্রস্তর মূর্তিতে,
আগুন জ্বলছে চিন্তাশীল মানুষের মননে, মোমবাতির আলোর ছবিতে।
এখন প্রশ্ন এ আগুন কে জ্বালায়? কেন জ্বালায়?
আগুন জ্বালায় মানুষের সীমাহীন ক্ষমতার লোভ,
মেগালোম্যানিয়াক নেতাদের দাদাগিরির লোভ;
মানুষের ভোগস্পৃহা, কাঞ্চন-কামিনীর কাম আর মোহ;
প্রতিবেশীকে গুঁড়িয়ে, পুড়িয়ে ছারখার করে দেবার ক্রোধ;
অসহিষ্ণু অধার্মিক মানুষের ধর্মের জিগির তুলে হানাহানি
অন্যের প্রতি ঈর্ষা, অসূয়া ও মাৎসর্য,
আর তার সঙ্গে নিজেকে অতিমানব ভাবার চিন্তাখানি।
সোনার ডিম পাড়া হাঁসের পেট ফুঁড়ে নিতে চায় ধরিত্রীর ঐশ্বর্য।
বিনিময়ে দেয় শুধু নিজেদের বিষাক্ত নিঃশ্বাস,
বিশ্ব প্রাণিকুল নিতে পারে না কো নিশ্চিন্ত শ্বাস,
পায় না বিশুদ্ধ বাতাস, পানীয় জল।
মেরুপ্রদেশের বরফ গলে ডোবে উপকূল, নোয়ার নৌকা করে টলমল।
কংক্রিটের জঙ্গলে ফুরোয় প্রকৃতির জঙ্গল -
উন্নয়নের জোয়ারে নিঃশেষ হয় আমাজন - পৃথিবীর অক্সিজেন সিলিন্ডার।
বিষে নীল হয় এ ধরিত্রী তোমার আমার।
কিন্তু সেই বিষের জ্বালা বুঝতে পারেন না ক্ষমতাশালী অহংকারী
কূটবুদ্ধিধারী রাষ্ট্রনিয়ন্ত্রকেরা। কারণ, "কি যাতনা বিষে, বুঝিবে সে
কিসে, কভু আশীবিষে দংশেনি যারে।" (কালিদাস রায়)
টোটো থেকে নেমে পায়ে হেঁটে অল্প এগোতেই হাসপাতালের এলাকা শুরু। হাসপাতাল
বিল্ডিঙের পাশ দিয়ে চওড়া রাস্তা। কিন্তু বীম ব্যারিয়ার দিয়ে আটকানো।
দ্বিচক্রযান ও পদব্রজে ছাড়া গমন নিষিদ্ধ। সামনেই একটি উজ্জ্বল লাল শিমুল
গাছ এবং তারপর অনেকগুলো কমলা ও কয়েকটি হলুদ পলাশ গাছের সারি। কিছুটা দূরে
দূরে হোর্ডিং-এ আবেদন গাছে হাত না দেবার। উপস্থিত প্রকৃতিপ্রেমী জনগণ কেউ
বা বিরাট চোঙের মতো ক্যামেরা নিয়ে নয়ত অত্যাধুনিক ডিজিটাল ক্যামেরাতে এই
দৃশ্য বন্দী করছে। কেউ বা নৃত্যের তালে তালে পলাশ বাগানে 'রীল' বানাচ্ছে।
আর সকলেই সুযোগ মতো নিচে থেকে ঝরে যাওয়া পলাশ সংগ্রহ করছে। কয়েকজন
স্থানীয় বাসিন্দাও উপস্থিত। তাঁদের কাছে শুনলাম কুড়ি-পঁচিশ বছর আগে অবধি
এই সরকারি এলাকার বাইরেও পলাশ বন ছিল। কিন্তু আজ তা প্রোমোটাররাজের থাবায়
নিশ্চিহ্ন। তবে আশার কথা এখন এই এলাকাটি সংরক্ষিত অঞ্চল হিসাবে চিহ্নিত
হয়েছে কিছু মানুষের ঐকান্তিক প্রচেষ্টায়।
"চিত্ত যেথা ভয়শূন্য, উচ্চ যেথা শির" মন্ত্রে দীক্ষিত হয়ে
শুভবুদ্ধিসম্পন্ন কিছু মানুষ তাঁদের সীমিত ক্ষমতায় শাসকের চোখে চোখ রেখে
চিৎকার করে বলছে, "রাজা, তোর কাপড় কোথায়?" তাঁদের নিঃশব্দ অহিংস
প্রতিবাদের উপর হচ্ছে আক্রমণ। রুদ্ধ করার চেষ্টা হচ্ছে তাঁদের কণ্ঠস্বর।
কিন্তু তাঁরা অদম্য। সেটাই আশার কথা। সেটাই 'সিলভার লাইনিং'। যেমন এই
প্রতিবাদ আন্দোলনের অন্যতম পুরোধা সুইডেনের কন্যা গ্রেটা থুনবার্গ। যিনি
কিশোরী বয়সে আমেরিকান প্রেসিডেন্টের মুখের উপর UNO Council এ তাঁকে
দোষারোপ করার সাহস দেখিয়েছেন। তাঁদের একমাত্র দাবি - "এ পৃথিবীকে এ শিশুর
বাসযোগ্য করে যাব আমি / নবজাতকের কাছে এ আমার দৃঢ় অঙ্গীকার।"
কিন্তু কিভাবে নেভানো যাবে ঐ রাষ্ট্রনেতা তথা যাঁদের অঙ্গুলিহেলনে তাঁরা
চলেন সেই বণিককুলের লোভের আগুন? তাঁদের শুভবুদ্ধি জাগরণের জন্য আজ
বিশ্বের বড় প্রয়োজন স্বামী বিবেকানন্দের মতো কোনো এক জাদুকরের, যিনি
আহ্বান করবেন, ‘Sisters and brothers of the world’, তোমরা দেখতে পাচ্ছ
না বিশ্ব মানবতা আজ অসহায় হয়ে তোমাদের দ্বারে উপস্থিত। বিশ্বপ্রকৃতি আজ
ধর্ষিত, কলুষিত। তাঁর অশ্রু আজ শুষ্ক। তাঁর পুনরুজ্জীবনের দায় তো
তোমাদের। 'উত্তিষ্ঠিত, জাগ্রত, প্রাপ্য বরান নিবোধত' (Arise, awake, and
stop not till the goal is reached)। বলবেন, ‘Do not shed blood, shed
hatred’। বলে উঠবেন, এসো আমরা ভালোবাসা দিয়ে বিশ্ব জয় করি।
এইভাবে ধ্বংসস্তুপের মধ্যে প্রেমের সিঞ্চনে জেগে ওঠে আশার চারাগাছ। ধূ ধূ
মরুভূমির রুক্ষ প্রান্তর থেকে ফিনিক্স পাখির মতো ডানা মেলে সবুজের
অভিযান। গেয়ে ওঠে 'আকাশ আমার ভরলো আলোয় / আকাশ আমি ভরবো গানে।' তাকে
বারংবার পদদলিত করতে চাইবে ঐ আপাত বুদ্ধিমান ক্ষমতাশালী নির্বোধের দল।
কিন্তু সফল হবে না কিছুতেই, কারণ -
'যত বড় হও, তুমি তো মৃত্যুর চেয়ে বড় নও
আমি মৃত্যু চেয়ে বড়
এই শেষ কথা বলে যাব আমি চলে।'