আত্মজা

সুমনা মজুমদার দাস,

কলকাতা

আমি আত্মজা, আমার কর্তাবাবা আর গিন্নিমা-এর আত্মজা। না-না, আমি কোনো কন্যা নই। আমি হলাম কন্যাসম স্নেহধন্যা একটি বাড়ি। হ্যাঁ, একটি বাড়ি; যার জন্ম হয়েছিল স্বাধীনতা প্রাপ্তির বছরের প্রারম্ভকালে অর্থাৎ নববর্ষে।

সেই নববর্ষ ছিল একটি পরিবারের বহু বছরের আশা, আকাঙ্ক্ষার পূর্ণতা প্রাপ্তির দিন, তাদের গৃহপপ্রবেশের দিন। সেইদিন নতুন রঙ এবং ফুলের গন্ধ যেন পূজোর ধূনোর গন্ধকেও হার মানিয়ে ছিল। বাড়ির সকলের আনন্দ উৎসাহ তখন সবই ছিল আমায় ঘিরে। আমিও যেন কর্তাবাবার তিন ছেলের মতোই নতুন পোশাকে সেজেছিলাম। সেইদিন থেকেই কর্তাবাবা তার আত্মজাকে প্রতি নববর্ষে নতুন রঙে রঙিয়ে তুলতেন। যা পরবর্তীতে একটি পারিবারিক রীতিতে পরিণত হয়েছিল।

আমার কর্তাবাবা মানে অখিলেশ সামন্ত ছিলেন লোহার ব্যবসায়ী এবং তার স্ত্রী লতিকাদেবী মানে আমার গিন্নিমা ছিলেন একজন সঞ্চয়ী নারী। তাঁর চেষ্টাতেই তাঁরা দুইজনে বহু বছর ভাড়াটে হয়ে থেকেও নিজস্ব বাড়ি তৈরির স্বপ্নকে বাস্তবায়িত করেছিলেন। তার জন্য তাদের অনেক ত্যাগ স্বীকার করে অর্থ সঞ্চয় করতে হয়েছে আর করতে হয়েছে এক দীর্ঘ অপেক্ষা। ওনাদের মতো যারা এমনই কষ্ট করে তাদের স্বপ্নের বাড়ি তৈরি করেছে একমাত্র তারাই অন্তর থেকে অনুভব করতে পারবে যে এই 'আত্মজা' তাদের হৃদয়ের কতখানি অংশ জুড়ে ছিল।

এই বাড়ি কেবল ইট-পাথরের দেওয়ালই ছিল না, ছিল এক মহীরুহ যে স্বচক্ষে দেশের স্বাধীনতা দিবসের স্বাক্ষী থেকেছে, বন্যা পরিস্থিতিতে সর্বহারাদের আশ্রয় দিয়েছে, খরার সময় তৃষ্ণার্থদের দিয়েছে নিজের কূয়োর জল। একবার এক কমিউনিস্টকে গোপনে কিছুকাল আশ্রয়ও দিয়ে ছিল। আজ এই সকল কথা কেবল স্মৃতি হয়েই বেঁচে রয়েছে কালের গর্ভে।

কর্তাবাবার তিন ছেলে, অনিমেশ, নিখিলেশ এবং সমরেশ।
অনিমেশ বর্তমানে তাদের পারিবারিক ব্যবসার হাল ধরেছে।
নিখিলেশ লেখাপড়ায় বেশ ভালো ছিল। সে বিদেশে ডাক্তারি পড়তে গিয়ে আর ফিরে আসেনি। সে পরিবারের সদস্যদের কাছে নিখোঁজ হয়েই রয়ে যায়।
ছোটো ছেলে সমরেশ ছেলেবেলা থেকেই পোলিওতে আক্রান্ত। কিন্তু সে খুব ভালো ছবি আঁকতে পারে। তার আঁকা ছবি ভালো দামেই বিক্রি হয়।

তা এই অনিমেশের তিনটি সন্তান। একমাত্র মেয়ে প্রভা এবং দুইটি যমজ ছেলে সরোজ এবং মনোজ। সরোজ ও মনোজ দুজনেই এখন জাপানে কর্মরত। তারা প্রতি বছর নাহলেও কালেভাদ্রে তাদের পরিবার নিয়ে আসে ছুটি কাটাতে।
প্রভার স্বামী দেবমাল্য রাজনীতি করে স্থানীয় পৌরপিতা হয়েছে। আর তার পর থেকেই সে অনিমেশের উপর বিভিন্ন ভাবে চাপ সৃষ্টি করতে থাকে 'আত্মজা' কে প্রমোটারদের হাতে তুলে দেওয়ার জন্য। কিন্তু অনিমশ তার স্বর্গীয় বাবা ও মা এর কাছে প্রতিজ্ঞাবদ্ধ ছিল যে নিখিলেশ না ফেরা পর্যন্ত সে যেন এই বাড়ি ছেড়ে না যায়। তাই এই বিষয়েটি নিয়ে অনিমশ এবং দেবমাল্যের বিতর্ক লেগেই থাকত।

একদিন দেবমাল্য সুদূর বিদেশ থেকে নিখিলেশ ও তার পরিবারকে 'আত্মজা 'তে এনে হাজির করল। হারানো ভাইকে ফিরে পেয়ে অনিমশ খুবই আনন্দিত হয়ে উঠেছিল। আর এই সুযোগেরই সদ্ব্যবহার করে দেবমাল্য। ফল স্বরূপ 'আত্মজা' প্রমোটিং-এ চলে যায়।

আজ আর এক নববর্ষের দিন। তবে আজকে অন্যান্য বছরের মতো বাতাসে নতুন রঙের গন্ধ নেই। সারা উঠান জুড়ে এক বাস্তু পূজোর আয়োজন চলছে। পুরোহিত বললেন যে এটা নাকি 'ক্ষমাপ্রার্থনা' পূজা, যা পুরোনো কোনো ভিটে ভাঙ্গার আগে করা হয়। আমার স্মৃতির গভীর থেকে জীবন্ত হয়ে ফিরে এসেছে সেই ১৯৪৭ এর নববর্ষের দিন। যে দিনটি ছিল আমার এক প্রকার জন্মদিন। আর আজ সেই একই দিনেই যেন আমার মৃত্যুদিন পালিত হচ্ছে। ভীষণ কষ্ট হচ্ছে আমার। তবুও আমি যাদের নিজের ছত্রছায়ায় বড়ো হতে দেখেছি, আমি সর্বদাই তাদের শুভকামনাই করি।

আজ এই পূজোর শেষে পুরোনো ইট-পাথরের ধুলোর মধ্যে চিরকালের জন্য স্মৃতি হয়ে রয়ে যাবে 'আত্মজা', আমার কর্তাবাবা আর গিন্নিমা-এর 'আত্মজা '।