আশ্রয়
অদিতি মন্ডল,
কলকাতা
আমাদের পাড়ার নেড়ি কুকুর কালির বড় উজ্জ্বল চোখ দুটো ছিল মায়ায় ভরা।
কিন্তু সেদিন থেকে ও চোখে যেন অসহায়তা আর নীরব প্রতিবাদের মিশ্রণে এক
অন্যরকম গভীরতা ফুটে উঠেছিল। যেদিন তার ঠিক করে চোখ না ফোটা ছয়টি
বাচ্চার একটি, কোনো নিষ্ঠুর মানুষের অমানুষিক আচরণে, দুদিন ধরে মারাত্মক
কষ্ট পেয়ে বটতলায় মারা গেল। কালি আকাশের দিকে মুখ করে উ-উ- শব্দে খুব
কেঁদে ছিল। যেন সে সদ্য সন্তান হারা মায়ের করুন আকুতি জানাচ্ছিল ঈশ্বরের
কাছে। সেই কান্নার শব্দ আকাশ বাতাস মথিত করে আমার বুকেও আছড়ে পড়েছিল।
কিন্তু কিই বা করতে পারি আমি! আমি শুধু মনে মনে বাকি বাচ্চাগুলোর জন্য
ঈশ্বরের কাছে সুরক্ষা প্রার্থনা করেছিলাম।
ঈশ্বরের কান পর্যন্ত আমার সে প্রার্থনা পৌঁছে ছিল কিনা আমি বলতে পারব না,
তবে কালি তার বাকি বাচ্চাদেরকে আরও কাছে টেনে নিয়েছিল, যেন মৃত্যু আর
কাউকে ছুঁতে না পারে।
সেদিন সন্ধ্যায় আমরা লক্ষ করলাম, কালি তার বাকি পাঁচটি বাচ্চাকে এক এক
করে মুখে নিয়ে আমাদের বাড়ির উঠোনে এসে ঢুকেছে। ঢুকেছে বললে ভুল হবে—সে
আশ্রয় নিয়েছে। কভার করে রাখা আমার বাইকের নিচে, অন্ধকার আর উষ্ণতার
মাঝামাঝি একটুকরো জায়গায়। যেন ও বুঝে গিয়েছিল, এখানেই তার সন্তানদের
জন্য নিরাপদ কোণটা আছে।
আমার শ্বশুরমশাই কুকুর খুব একটা পছন্দ করেন না। তিনি পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন
মানুষ, অযথা ঝামেলা একেবারেই সহ্য হয় না। কিন্তু ছোটবেলা থেকেই কুকুর
আমার দুর্বলতা। কথা না বলেও যারা কত কিছু বোঝায়, তাদের আমি ভালোবাসি।
অবশ্য বাড়ির সবাই আমার সেই ভালোবাসার মর্যাদা দেয়। তাই ঠান্ডায়
বাচ্চাগুলোর কষ্ট হবে ভেবে আমি আর আমার স্বামী মিলে বাঁশ, ইট আর কাঠ
জোগাড় করে উঠোনের এক পাশে ছোট্ট একটা ঘর বানিয়ে দিলাম।
তারপর যেন উঠোনটা বদলে গেল। দিনের বেলা বাচ্চাগুলো ছোটাছুটি করে,
গড়াগড়ি খায়, একে অন্যের লেজ ধরে টানাটানি করে খেলায় মেতে ওঠে।
সন্ধ্যা নামলেই, অদ্ভুত শৃঙ্খলায়, তারা একে একে সেই ছোট্ট ঘরের ভিতর
ঢুকে পড়ে।
কিন্তু কালিই আমাদের সবচেয়ে বেশি শেখাল।
জীবনে প্রথমবার এমন একটি মা কুকুর দেখলাম—যে নিজের পাঁচটি সন্তানের
সুরক্ষা আর খাবারের জন্য আমাদের বাড়িতে রেখে গেলেও, আমাদের বোঝা হবে
ভেবে নিজে এখানে খায় না। পেটে অসম্ভব খিদে নিয়ে সে অন্য বাড়িতে
খাবারের সন্ধানে ঘুরে বেড়ায়। তবু দিনে দুবেলা ঠিক এসে যায়। দুধ
খাওয়ায়, বাচ্চাদেরকে যেন গুনে নেয়—পাঁচটা আছে কি না। তারপর নীরবে চলে
যায়।
একদিন দুপুরের দিকে বাচ্চাগুলোর কাঁউ কাঁউ আওয়াজ শুনে আমি উপরের ঘরের
ব্যালকনিতে এসে দাঁড়ালাম। তাকিয়ে দেখি কালি শুয়ে তার বাচ্চাদেরকে দুধ
খাওয়াচ্ছে আর তার রোগা শরীরের ক্ষুধা কাতর পেটটা শ্বাস প্রশ্বাসের সাথে
সাথে হাঁপরের মতো ওঠা নামা করছে। কালীর শরীরে বোধহয় বাচ্চাদেরকে
খাওয়ানোর মতো পর্যাপ্ত পরিমাণে দুধ তৈরি হচ্ছিল না, আর সেই জন্যই
বাচ্চাদের পেটের খিদে না মেটাতে তারা কাঁউ কাঁউ করে কাঁদছিল। আমি কি করবো
বুঝে উঠতে পারছিলাম না। কাজের মাসি বা রান্নার পিসি বাড়ি চলে গেছে।
নিত্য দিনের মতো তারা আবার সন্ধ্যের ঠিক আগে আগেই আসবে। তাই নিজেই একবার
নিচে কিচেনে এসে দেখলাম কি আছে। ফ্রিজে সসপ্যানে রাখা দুধ আর হাঁড়িতে
রাখা অল্প একটু বাড়তি ভাত দেখে মনটা খুশিতে ঝলমল করে উঠলো। একটা পাত্রে
সেই ভাত আর দুধ একটু ভালো করে চটিয়ে মেখে দিলাম। মনে সংশয় ছিল অত
টুকুটুকু বাচ্চা খেতে পারবে কি! কিন্তু বাচ্চাগুলোর কষ্ট ও আমার চোখে
সহ্য হচ্ছিল না। যাইহোক দোনা-মনা করে আমি বাচ্চাদের মুখের সামনে ভাতগুলো
দিয়ে চুকচুক করে মুখে আওয়াজ করতেই বাচ্চাগুলো দৌড়ে এলো আর তারপর আমাকে
অবাক করে তাদের ছোট্ট ছোট্ট জীভ গুলো দিয়ে চটাং চটাং করে চেটেপুটে খেতে
লাগলো সেই দুধ-ভাত। সেই দৃশ্য দেখে আমার যে কি ভালো লাগছিল সে ভাষায়
প্রকাশ করতে পারবো না। আর কালিও আমার চোখের দিকে এমন কৃতজ্ঞতার দৃষ্টিতে
তাকিয়ে ছিল যেন আমাকে ধন্যবাদ জানাচ্ছিল।
এরপর থেকে রান্নার পিসিকে বলে রেখেছি— দুবেলা ওদের জন্য আলাদা করে চাল
নেওয়ার। আমাদের সংসারে যেমন সবার জন্য হিসেব থাকে, তেমনই ওদের জন্যেও
একটা হিসেব তৈরি হয়ে গেছে।
সকাল- দুপুর- রাত্রি, দিনে তিনবার করে পেট ভরে খাবার খেয়ে বাচ্চাগুলো
অচিরেই বেশ বড়ো আর নাদুসনুদুস হয়ে উঠেছে।
আমার জানা নেই কুকুররা সময় কিভাবে বুঝতে পারে, রোজ মোটামুটি দুপুরবেলা
একটা থেকে দেড়টার মধ্যে আমাদের খাওয়া-দাওয়ার পাট চুকে যায়। তারপর
আমার কাকা শ্বশুর কালির বাচ্চাদের জন্য ভাত মেখে দেয় আর তারা খায়। রোজ
কালি এসে দেখে যায় তার বাচ্চাদের পেট ভরা আছে কিনা।
একদিনের কথা বলি, সেদিনটা ছিল বোধহয় রবিবার। আর তার উপরে আমাদের বাড়িতে
আমার ছোট পিসি শাশুড়ির ছেলে মানে আমার দেওর এসেছিল। স্বাভাবিকভাবেই
আত্মীয় স্বজন বাড়িতে কেউ এলে একটু বেশিই রান্নাবান্না হয়। আর গল্প
গাছা করতে করতে সেদিন লাঞ্চ করতে বসতে আমাদের প্রায় দুটো বেজে গিয়েছিল।
খাবার টেবিলে বসে আমি অবাক চোখে দেখলাম কালি চুপচাপ এসে দরজার সামনে
দাঁড়িয়ে উঁকিঝুঁকি মারছে, একবারও কিন্তু ভিতরে আসার চেষ্টাও করল না,
কেবল বাইরে থেকে এমন ভাবে তাকালো আমার চোখের দিকে যেন বলতে চাইল -
"সময় তো সেই কখন পেরিয়ে গেছে, কখন আমার বাচ্চাদের জন্য খাবার দেবে!"
ওর বাচ্চাদের প্রতি ওর এই ভালোবাসা আর আমাদের প্রতি ওর এই শিষ্টাচার
আমাকে যেন লজ্জায় ফেলে দিল। আমি খাবার টেবিল থেকে উঠে রান্নার পিসিকে
বললাম
"তুমি আগে কালির বাচ্চাদের জন্য খাবার তুলে দাও পিসি, তারপর আমি খাবার
খাব।"
খিদেয় কালির পেট চুপসে থাকলেও, বাচ্চাদের খাবারে কখনও সে মুখ বাড়ায়
না। একদিন আমি আলাদা করে ওকে খাবার দিলাম। সেই খাবারের গন্ধ পেয়ে ভরা
পেটেও বাচ্চাগুলো দৌড়ে এল। কালি তখন নিজে এক কদম পিছিয়ে গেল—মুখ
ঘুরিয়ে দাঁড়াল, যেন তার বাৎসল্য প্রেমের সামনে পেটের ক্ষুধা লজ্জা
পেয়ে গেছে। বাচ্চাগুলো না খাওয়া পর্যন্ত সে ঠায় দাঁড়িয়ে রইলো তারপর
কোনরকম অভিযোগ বা অনুযোগ না করে চুপচাপ সেখান থেকে চলে গেল।
বাচ্চাগুলো এখন বেশ বড়ো হয়েছে তবে খুব ভীতু। এতদিন খাওয়াচ্ছি, বা
আশ্রয় দিয়েছি তবু আদর করতে গেলে দৌড়ে পালায়। তবু আশ্চর্য এক বিশ্বাস
আছে ওদের মধ্যে। কখনো যদি বাইরে বেরিয়ে এদিক-ওদিক ঘুরে বেড়ায় আর
আমাদের নজরে পড়ে যায়, আমরা উপরের ঘর বা ছাদ থেকে বলি—
“এই! এখানে ঘুরছিস কেন? যা, ঘরে যা।”
ওরা তখনই গলিপথ ঘুরে, কোনো দ্বিধা ছাড়াই, নিজেদের ঘরে ঢুকে পড়ে। যেন
আমাদের গলার স্বরটাই তাদের ঠিকানা।
এই উঠোনে এখন শুধু মানুষ থাকে না। থাকে এক মায়ের নিঃশব্দ সাহস, ক্ষুধার
ওপর জয়, আর বিশ্বাসের ছোট ছোট কুড়িটি পায়ের ছাপ। কালি আমাদের বাড়িতে
শুধু আশ্রয়ের জন্য আসেনি—সে আমাদের দেখিয়ে গেছে, মা হওয়া মানে কী।
আর আমরা, অজান্তেই, তার সেই শিক্ষার ছাত্র হয়ে গেছি।