অমূল্য প্রাপ্তি

অনিন্দিতা গুড়িয়া,

নিউ-দিল্লি

এবছর করুণা বৃন্দাবন বেড়াতে যাবার ইচ্ছে প্রকাশ করেছে আমার কাছে। সামনেই পূজা, অবশ্য পূজা বলে দিল্লি শহরে বিশেষ কোনো ছুটি ছাটার বালাই নেই। তবুও অফিসে বলে কয়ে এক সপ্তাহের ছুটি জোগাড় করেছি। করুণা খুব খুশি মনে মনে, আর আমিও খুব খুশি করুনাকে খুশি করতে পেরে।

করুনা আমার স্ত্রী, পশ্চিমবঙ্গের এক অখ্যাত গ্রামের মেয়ে। আমাদের বিয়ের আগে কোথাও বেড়াতে যায়নি সে। বিয়ে হয়ে আমার সঙ্গে এসেছে দিল্লি। দিল্লিতে আমি আছি প্রায় ৭ বছর। বিয়ের সময় একটা টুরিস্ট কোম্পানিতে চাকরি করতাম, আর সেই জন্যই মাসের মধ্যে ২৫ টা দিন আমার বাইরেই কাটতো। এ নিয়ে বিয়ের প্রথম প্রথম খুবই অসুবিধা হয়েছে করুণার। ঘরের বাইরে পা রাখা মানে হিন্দি বলা, আর করুণার হিন্দি যে না শুনেছে সে বিশ্বাস করবে না যে কি ভয়ংকর রকমের ভুল উচ্চারণ আর সব কথার সঙ্গে উঙ্গি যোগ করে কথা বলা। রীতিমতো হাস্যকর শোনাতো। এই নিয়ে করুণার মনে মনে দুঃখ ছিল যে সে এখনো পর্যন্ত স্থানীয় ভাষাটা রপ্ত করতে পারল না। তার উপরে অজানা অচেনা শহরে একলা থাকতেই ওর ভয় ও করত খুব। আমি না থাকলে বেশিরভাগ দিন হয় এক বেলা, নয়তো আধ পেটা খেয়েই থাকতো। মনে মনে ভয়, পাছে রেশন বাজার ফুরিয়ে গেলে বাজারে যেতে হয় সেই জন্যেই। এইসব দেখে শুনে আমি আমার পুরানো চাকরি বদল করতে বাধ্য হলাম।

মাস ছয়েক হয়েছে আমি একটা নতুন অফিসে কাজে লেগেছি। এখন আমরা দুজনেই খুশি। এতদিন করুনাকে নিয়ে কোথাও বেড়াতে যাইনি। এই প্রথম আমরা কোথাও বেড়াতে যাব। বিয়ের পর থেকে দেশেও যাইনি। যাব কোথায়? হয় ওর দাদার বাড়ি, নয়তো আমার মামার বাড়ি। দুজনেই আমরা মা-বাপ হারা । থুড়ি থুড়ি বাবা আমার থাকে দেশের বাড়ি আরামবাগে, আমার সৎ মা আর সৎ তিন ভাই বোনের সাথে। মা মারা যাবার পর দু বছর বয়স থেকেই আমি মামা বাড়িতে মানুষ। বাবার সঙ্গে কোন যোগাযোগ নেই বললেই চলে। আর করুণার মা বছর সাতেক আর বাবা বছর পাঁচেক আগে গত হয়েছেন। বিয়ের আগে ও ওর দাদা বৌদি আর দুই ভাইপো ভাইজিদের সাথে থাকতো। দাদার সংসারে দুবেলা খাবার জন্য বৌদির হাতে হাতে সারাদিন কাজ করতে হতো। একটু এদিক ওদিক হলেই চলতো মা বাপ তুলে গালিগালাজ, আর বেশি সদয় হলে চড় থাপ্পড় ও জুটে যেত এক আধটা।

আমাদের বিয়ের ব্যাপারে বেশ একটা মজার ঘটনা আছে। ছোট থেকে মানুষ হয়েছি মামার বাড়ি কলকাতায়, আর তারপরেই কর্মসূত্র চলে এসেছে দিল্লি। সেই জন্য গ্রাম দেখার সাধ ছিল অনেকদিন থেকেই। তা ছুটিতে মামা বাড়িতে গেলে মামাতো ভাই দীপ আর ওর তিন বন্ধুর সাথে পরামর্শ করা হয় কোথাও বেড়াতে যাবার জন্য। তা দ্বীপের বন্ধু গৌরব বলল চলো না সুপ্রিয় দা, আমরা একটা অ্যাডভেঞ্চারে যাই। সবাই রাজি। আমি বললাম এডভেঞ্চারে যদি যেতেই হয় তবে চল আমরা শরৎচন্দ্র বর্নিত গ্রাম খুঁজে আসি, মানে এক্সপ্লোর করব। যেখানে বাঁশবাগান, এঁদোপুকুর, ডোবা, ঝিঁঝিঁর ডাক, খালপাড়ের শ্মশান, দৈত্যের মতো তেঁতুল গাছ আর সব বড় বড় গাছের জঙ্গল আছে। আর আছে মাটির ঘর আর কেরোসিনের বাতি।

আমার কথা শুনে সবাই বেশ খুশি আবার হতাশ ও হয়েছি! এই আধুনিক যুগে গ্রাম বলে যে জায়গা আছে তা গ্রাম নয়, মফস্বল । আমি কিন্তু একটুও দমে যাইনি। আমি বললাম নিশ্চয়ই পাওয়া যাবে, চল না একটু খোঁজ করি। যদি খোঁজই না করলাম তবে অ্যাডভেঞ্চার কিসের হল!

সবাই নিমরাজি হলেও বেড়াতে যাওয়ার ঠিক হলো। কিন্তু কোথায় যাওয়া হবে, সেই নিয়ে যখন সবাই চিন্তা করছে এমন সময় হৈ হৈ করতে করতে আমার মাসতুতো ভাই শঙ্খ এসে হাজির। সব শুনে সে জানালো চিন্তার কিছু নেই, তাদের সব ভাই-বোনেদের যিনি মানুষ করেছেন, সেই রাঙা পিসির শ্বশুরবাড়ি এক অখ্যাত গ্রাম বলরামপুরে। রাঙা পিসির মুখে শুনেছে সেখানে দিনের বেলাতেও বাঘের ভয়। অতএব ঠিক হলো বলরামপুরেই যাওয়া হবে।

অনেক রাত অবধি গুছান গাছান করার পর শুতে গেলাম আমরা সবাই। পরদিন ভোর পাঁচটার সময় আমরা বেরিয়ে পড়লাম বলরামপুরের উদ্দেশ্যে।

আমাদের পথপ্রদর্শক এখন শঙ্খ। সে রাঙা পিসির মুখে শোনা কথা অনুসরণ করেই আমাদেরকে পথ দেখাচ্ছে আর আমরাও ওকে অনুসরণ করে চলেছি। বেলা প্রায় এগারোটা নাগাদ আমাদের দল গিয়ে পড়ল দাসরথীপুরে। সেখানে ছোটখাটো একটা রেস্টুরেন্ট দেখে আমরা সকালবেলার জলযোগ টা সেরে নিলাম। চারটে করে ডিমের পরোটা, আলুর দম আর এক কাপ করে কড়া চা। তবে এটাকে জলযোগ না বললেই ভালো। খাওয়া শেষ করেই বড় বড় ঢেকুর তুলে আবার আমরা রওনা হলাম বলরামপুরের উদ্দেশ্যে।

মাঠ ঘাট ঝোপ জঙ্গল ভেঙে হাত-পা মুখে মাথায় ধুলো বালি মেখে লোককে জিজ্ঞেস করতে করতে যখন আমরা বলরামপুরে পৌঁছালাম তখন বেলা প্রায় পড়ে এসেছে। সবাই যে যার কাঁধের ব্যাগ ফেলে দিয়ে বিশ্রাম করতে চাইছে। কিন্তু বিশ্রাম করবে কোথায়? বলরামপুর তো পাওয়া গেল, কিন্তু রাঙা পিসির শ্বশুরবাড়ির কাউকেই পাওয়া গেল না। লোকে বললে ওরা অনেকদিন আগেই এই গ্রাম ছেড়ে চলে গেছে অন্য কোথাও।

কি করব কোথায় যাব ভাবতে ভাবতে দিবাকর মন্ডল নামে একজন লোকের সঙ্গে আমাদের পরিচয় হলো। ভদ্রলোক টাকার বিনিময়ে তার বাড়িতে রাত কাটাবার ব্যবস্থা করলেন। ভাবলাম রাতের আস্তানা যখন মিলেছে তখন এডভেঞ্চার খুব একটা খারাপ হবে বলে মনে হয় না। যাইহোক রাত্রে ডাল, ডিম ভাজা, আলু সিদ্ধ আর চুনো মাছের টক দিয়ে রাতের খাবার সমাধা করে আমাদের জন্য নির্দিষ্ট একটা ঘরে শুতে গেলাম। মাটির ঘর, খড়- তালপাতা দিয়ে ছাওয়া। ছোট্ট একটা জানালা। বাইরে ঝোপেঝাড়ে অজস্র জোনাকি মিটমিট করে জ্বলছে। হঠাৎ কাছে কোথাও শেয়াল ডেকে উঠল। জীবনে এই প্রথমবার আমি শিয়ালের ডাক শুনলাম। অন্ধকার নির্জন রাত্রে সে ডাক শুনলে সত্যিই হঠাৎ ভয় পেয়ে যাবে মানুষ। ক্লান্ত থাকায় আমরা সবাই ঘুমিয়ে পড়েছি। বড়জোর ১০-১৫ মিনিট ঘুমিয়েছি, মশার কামড়ে আমার ঘুমটা ভেঙে গেল। অন্ধকারের মধ্যেই ঘুম জড়ানো চোখে কিছুক্ষণ এপাশ-ওপাশ করে দু'চারটে চড় থাপ্পড় মেরে মশা তাড়ানোর বিফল চেষ্টা করছি। এরমধ্যে হঠাৎ আমার চোখ জ্বালা করতে লাগলো আর দেখলাম ঘন ধোঁয়ার মধ্যে কেউ যেন আমাদের ঘরের মধ্যে ঘোরাফেরা করছে। ভূতের ভয় আমার কোনদিনই ছিল না। তাই ভূত না ভেবে চট করে আমার মাথায় এলো চোরের কথা। চোর নয় তো? রাতের অন্ধকারে আমাদের জিনিসপত্র চুরি করতে এসেছে!

- হ্যাঁ, এই অন্ধকারে নিশুতি নির্জন রাত্রে এইভাবে ঘরের এদিক থেকে ওদিকে নিঃশব্দে ঘুরে বেড়াচ্ছে এ নিশ্চয়ই চোর না হয়ে যায় না। এই অ্যাডভেঞ্চার কে আরও স্মৃতি পটে ধরে রাখার লোভ আমি আর সামলাতে পারলাম না। আমার পাশেই দ্বীপ ঘুমোচ্ছে, আমি আলতো করে ঠেলা দিয়ে ডাকলাম - দ্বীপ এই দ্বীপ, ওঠ। ঘরে চোর এসেছে। দীপ তো ধড়মড়িয়ে জাগতে যাচ্ছিল।
আমি তাকে ফিসফিসিয়ে বললাম- চুপ বেশি শব্দ করলে চোর পালিয়ে যাবে।
দ্বীপ বলল - তোমার কি মাথা খারাপ সুপ্রিয় দা! যদি ছুরি চাকু কিছু কাছে থাকে, যদি ঢুকিয়ে দেয় পেটের মধ্যে? আমি বাবা চোর ধরতে যাচ্ছি না, তোমার যদি ইচ্ছা থাকে তুমি ধরো।
অগত্যা আমি একাই চুপিচুপি গিয়ে পিছন থেকে জড়িয়ে ধরলাম চোরকে, আর চেঁচাতে লাগলাম -চোর চোর!
চোর যত বলে- আরে ছাড়ুন মশাই, আমি চোর নই, আমি করুণা।
আমি তত জোরে জাপটে ধরি।
সবথেকে আগে দ্বীপ দৌড়ে আসে, বলে- কি হলো সুপ্রিয় দা , ছুরি চাকু মেরেছে নাকি?
আমি বলি - আগে টর্চ জাল, ব্যাটাকে দু চার ঘা আচ্ছা করে দিই। ব্যাটা চোর আবার বলে সে চোর নয়!
আমাদের দলের আর সবাই জেগে গিয়ে দৌড়ে আসে। টর্চের আলো যখন চোরের উপর ফেলা হলো তখনও আমি চোরকে জাপটে ধরেই আছি।
আমি চোরের দিকে তাকিয়ে হতভম্ব হয়ে যাই, আরে এ তো একটা মেয়ে! লজ্জায় মেয়েটা মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে আছে আর তার চোখ থেকে জল গড়াচ্ছে। আমরা যখন তাকে জিজ্ঞাসা করি সে কে, কেন ঢুকেছিল আমাদের ঘরে?
তার উত্তর মেয়েটা জানায়- সে করুণা, এই বাড়িরই দিবাকর মন্ডলের ছোট বোন। খাবার পরে এঁটো বাসন মেজে পুকুর ঘাট থেকে ফেরবার সময় ও দেখে আমরা অকাতরে ঘুমোচ্ছি তো বটে, তবে মশার জ্বালায় ছটফটও করছি। তখন ও মাটির সরাতে করে ঘুঁটে জ্বালিয়ে নিয়ে এসেছে মশা তাড়ানোর জন্য। আর ঘরের মধ্যে ঢুকে ঘরের সব কোনায় কোনায় ঘুঁটের ধোঁয়া দিচ্ছিল।

আমাদের চেঁচামেচিতে এতক্ষণে গৃহকর্তা দিবাকর মন্ডল আর তার স্ত্রী কালিন্দী ঘুম জড়ানো চোখে উঠে এসেছেন। আমাদের মাঝে করুণাকে দেখে দিবাকার বাবুর জিজ্ঞাসা করলেন - করুণা তুই এ ঘরে এত রাতে! কি ব্যাপার?

করুণা কিছু উত্তর দেওয়ার আগেই ওর বৌদি কালিন্দী ঝংকার দিয়ে চোখে মুখে একটা বিশ্রী ইঙ্গিত করে ঝাঁঝিয়ে ওঠে। বলে- বুঝতে পারছ না, দাদা বৌদির ঘাড়ে বসে খেয়ে যে গতর করেছে তা বাইরের পাঁচজনকে না দেখালে কি হয়? কাল সকাল হোক, দূর করে দেবো মা বাপ খাকিকে। বলি, যে খাওয়ায় পরায় শত্রুরে ও তার মাথায় কালী ঢালতে দশবার ভাবে। আর এই মেয়ে দাদা বৌদির মাথায় একেবারে ইয়ে...করে দিলে গো!

লজ্জায় অপমানে করুনা ডুকরে কেঁদে ওঠে, -অমন করে বলো না বৌদি, ওদের মশা কামড়াচ্ছিল তাই একটু ধোঁয়া দিতে ঢুকেছিলাম ঘরে। ওরা ভুল বুঝে আমাকে চোর ভাবে........তারপরে আর কথা শেষ করতে পারে না, হাউ হাউ করে কেঁদে ফেলে।

এই রকম নাটকীয় পরিস্থিতির জন্য আমরা একটুও তৈরি ছিলাম না। যার কারণে বিস্ময়ে লজ্জায় আমার মাটিতে মিশে যাবার উপক্রম হলো। যাইহোক নানা কটু কথা শুনে চোখ মুছতে মুছতে করুনা বেরিয়ে যায় ঘর থেকে, আর ওর পিছনে পিছনে ওর দাদা বৌদি ও বেরিয়ে যায়।

ঘরের আবহাওয়া কেমন যেন দম বন্ধ করা, এই পরিবেশকে হালকা করতে শঙ্খ বলে ওঠে - আর কি শরৎচন্দ্র বর্নিত দেশ দেখতে এসে শরৎ বাবুর গল্পের নায়কের মত করুনাকে উদ্ধার করো তুমি সুপ্রিয় দা।

এই কথা শুনে সবাই হাসতে যাচ্ছিল, কিন্তু সবাইকে চুপ করিয়ে দিয়ে আমি ঘোষণা করলাম- তাই হবে!
সবাই তো যাকে বলে হতভম্ব! সবাই একসঙ্গে বলে ওঠে- তুমি কি খেপেছো সুপ্রিয়দা, এই বোন দেশের এক অজানা অচেনা মেয়েকে তুমি কিনা বিয়ে করবে!

অবশেষে সব জিজ্ঞাসার অবসান ঘটিয়ে পরদিনই আমি করুণাকে বিয়ে করে সেবারের মতো অ্যাডভেঞ্চার পর্ব শেষ করে কলকাতার পথে রওনা দিলাম। অবশ্য এটাও অ্যাডভেঞ্চারের থেকে কিছু কম নয়।
কলকাতায় ফিরে পরদিনের দিল্লি যাবার ট্রেনের দুটো তৎকাল টিকিট কেটে অরুণা কে নিয়ে দিল্লির ট্রেনে চড়ে বসলাম। আর সেই থেকেই আমরা দিল্লিতেই আছি। যাইহোক এইসব পুরনো কাসুন্দি ঘেঁটে আর কাজ নেই।
ফেরা যাক বর্তমান সময়ে।

অবশেষে মহাষ্টমীর দিন আমরা রওনা হলাম বৃন্দাবনের উদ্দেশ্যে। করুনার সেকি আনন্দ! ছোট বাচ্চার মত হাসিতে কথায় উচ্ছল হয়ে উঠেছে বারবার। বৃন্দাবনে পৌঁছে নানা জায়গায় নানা মন্দিরে মন্দিরে ঘুরে বেড়ালাম আমরা। তিনটে দিন কিভাবে যে কেটে গেল যেন বুঝতে ও পারলাম না। আজ রাত্রের গাড়িতে দিল্লি ফিরবো আমরা। সন্ধ্যেবেলায় গেলাম যমুনার ঘাটে আরতি দেখতে। আরতি দেখে ফেরার পথে দেখলাম অজস্র ভিখারি মাটিতে নোংরা আঁচল, ওড়নি, গামছা বিছিয়ে বসে আছে। সবার মুখে একই কথা- কুছ দে দো বাবা, অথবা হরে কৃষ্ণ হরে কৃষ্ণ। এরই মধ্যে স্পষ্ট বাংলা উচ্চারণ শুনে না দাঁড়িয়ে পারলাম না। - বাবা কিছু দাও, দুদিন ধরে উপোস আছি। তাকিয়ে দেখি এক শির্ণকায় বৃদ্ধা মহিলা, পরনে শত ছিন্ন ময়লা পোশাক আর ততোধীকে জীর্ণ একখানা গামছা মাটিতে বিছিয়ে বসে বসে ভিক্ষা করছে। কি মনে করে একখানা 10 টাকার নোট পকেট থেকে বের করে বৃদ্ধা ভিখারিনীর হাতে দিতে গেলাম। - মহিলাটি আমার মুখের দিকে ফ্যাল ফ্যাল করে তাকিয়ে আছে আর তার মুখখানাও যেন আমার কেমন চেনা চেনা ঠেকছে। হঠাৎ তিনি আমার হাত দুটো খপ করে ধরে হাউ হাউ করে কাঁদতে লাগলেন। আমি কিছু বুঝে ওঠার আগেই তিনি বলে উঠলেন - আমায় চিনতে পারলে না ছোট বাবা? হঠাৎ আমার মনে পড়ে গেল এই নামে তো আমাকে একজনই ডাকতো- রাঙামাসি......

যিনি আমাকে, আমার মামাতো মাসতুতো ভাই বোনেদেরকে কোলে পিঠে করে মানুষ করেছেন। যার শ্বশুর গ্রামে আমারও বিয়ে হয়েছে। আমি বিস্ময়ে অবাক হয়ে গেলাম, তারপরে তার হাত ধরে তুলে নিয়ে গেলাম কাছাকাছি একটা খাবারের দোকানে। সেখানে বসিয়ে তাকে ভরপেট খাবার খাওয়ালাম। খাবার আর জল খেয়ে একটু সুস্থ হলে আমরা একটা পরিচ্ছন্ন ফাঁকা জায়গা দেখে বসলাম। তারপর আমি ধীরে তাকে জিজ্ঞাসা করলাম তার এই অবস্থা কেন? আর কিভাবেই বা তিনি সুদূর কলকাতা থেকে এই বৃন্দাবনে এসে পৌঁছালেন!

রাঙামাসি অনেক কথাই বললেন, সেই সব কথা লিখতে গেলে প্রায় একটা গোটা ইতিহাস হয়ে যাবে। তাই ছোট করেই বলি- আমাদের রাঙামাসির যখন বিয়ে হয় বয়স বোধ করি ১৩ থেকে ১৪ বছর হবে। সেই তুলনায় মেসোমশাই-এর বয়স প্রায় দ্বিগুণেরও বেশি। প্রায় ৩৫, ৩৬ হবে। তা যাই হোক বিয়ের বছর তিনেক বাদে তাদের একমাত্র সন্তান মাসকয়েকের দুলালকে রেখে দিয়ে মেসোমশাই হঠাৎ করেই দেশান্তরী হয়ে কোথায় যে চলে গেলেন, অনেক চেষ্টা করো তার কোন খোঁজ খবর পাওয়া গেল না । এমতাবস্থায় শশুর বাড়ির লোকজন শ্বশুরবাড়ি থেকে 'হতভাগী স্বামী খাকি'- বলে অপবাদ দিয়ে তাড়িয়ে দেয় রাঙ মাসিকে। কোথায় আর যাবে? কোলের ছেলেকে নিয়ে উঠলো গিয়ে বাপের বাড়ি। তা বছর দুয়েক বাদে মা বাবা হলেন গত। দাদা বৌদিরা দিনরাত মুখে ঝামটা দেয়। এই সব দেখেশুনে আমার ছোট মাসির শাশুড়ি রাঙামাসিকে তার তিন বছরের ছেলে সমেত রেখে দিলেন নিজেদের বাড়িতে। আমার মাসিও তখন আসন্ন প্রসবা। এরপর মাসির যথাক্রমে দুই পুত্র সন্তান এবং তিন কন্যা সন্তানের জন্ম হয়। মাঝে আমার এবং আমার দুই মামাতো ভাইয়ের ও জন্ম হয়। আমাদের সবার জন্মের সময় আমাদের মায়েদের কাছে থাকা, আমাদেরকে দেখাশোনা করা, ইত্যাদি সবকিছুই করেছে রাঙামসি।

এইভাবে রাঙামাসি আমাদের পরিবারেরই একজন হয়ে গেছে। রাঙামাসির ছেলে দুলাল দার পড়াশোনায় মন ছিল না, অনেক চেষ্টা চরিত্রি করেও ক্লাস সেভেনের বেশি পড়াশুনাই হয়নি তার। তাই আমার বড় মামা দেখে শুনে একটা দোকানে কাজে লাগিয়ে দেয়। কখনো রাঙামাসি আমার মামার বাড়ি, আবার কখনো আমার মাসির বাড়িতে, যখন যেখানে ডাক পড়তো হাজির হত রাঙামাসি তার গাল ভরা হাসি নিয়ে। বেজার হতে জানতো না মানুষটা। শখের মধ্যে দিনে ৫-৬টা করে পান খেত, দোক্তা আর সুপরি ভরে। এই ভাবেই চলছিল দিন।

তারপর আমি চলে আসি দিল্লি। মাঝেমধ্যে যখনই গেছি তখনই দেখেছি একই রকম আছে রাঙামাসি। আমাদের ভাই বোনেদের সবাইকে ডাকতেন- কেউ বড় বাবা, কেউ বড়মা, কেউ ছোট মা, আর আমি ছিলাম মা হারা তার চোখের মনি ছোট বাবা। এরপর একদিন তার শ্বশুর গ্রাম প্রদর্শন করতে গিয়ে দুম করে বিয়ে করে বসলাম করুণাকে আর তারপর থেকেই তিন বছর কলকাতার সঙ্গে আমার কোন যোগাযোগ নেই বললেই চলে।

এই তিন বছরে আমার অজ্ঞাতে অনেক কিছুই পরিবর্তন ঘটে গেছে।
দুলাল দা যে দোকানে কাজ করতো, সেই দোকানের মালিকের মেয়ে ষষ্ঠী কে বিয়ে করেছে আর মালিকও মারা গেছেন। তাই বর্তমানে দোকানের অর্ধেক মালিক দুলালদা। বাকি অর্ধেকের মালিক দুলাল দার শালা রমানাথ গুছাইত। যাইহোক বিয়ের সময় দুলাল দা নিজের মাকে নিতে এসেছিল, কিন্তু তখন আমার মেসোমশাইয়ের হার্টের অপারেশন হওয়াতে রাঙামাসির আর যাওয়া হয়নি। এর মাস সাত আটেক বাদে একদিন সন্ধ্যেবেলা দুলালদা হঠাৎ করেই এসে হাজির আমার মাসির বাড়ি। আর তারপর আজেবাজে যত গালিগালাজ করে প্রায় একরকম জোর করে রাঙ্গামাসি কে নিয়ে চলে যায়। সবাই ভাবল- ছেলে অনেকদিন মা ছাড়া, তাই এমনিতে তো যাবে না সেই জন্যই গালিগালাজ করে মাকে নিয়ে গেল। সবাই বলল - যাই হোক এতদিনে ভগবান রাঙ্গামাসির দুঃখ ঘুচিয়েছে।

কিন্তু কথাই বলে- 'ঢেঁকি স্বর্গে গেলেও ধান ভানে'। আমাদের রাঙা মাসীর ভাগ্যেও তাই। আমার মাসির সংসারের দায়িত্ব ঝেড়ে ফেলে দিলেও ছেলে বউয়ের সংসারের সব দায়িত্বই রাঙামাসির উপরে ন্যস্ত হোল। অনেক অভিযোগ অনুযোগের মধ্যেও মানিয়ে নিয়েছিল রাঙামাসি। কিন্তু দিন দিন বউয়ের আর তার মায়ের কটু কথার ভার এত বেড়ে গেল যে রাঙ্গামাসির অসহ্য হয়ে উঠলো। আমার মাসির বাড়ি যেতেও মন সায় দেয় না। ছেলে দুলাল যেভাবে সবাইকে কটু কথা বলে অপমান করে তাকে নিয়ে এসেছে তারপর আর কোন মুখে যাবে ও বাড়িতে! এদিকে দুলাল দাও যেন বেশ বিরক্ত। মাকে নিয়ে কোথায় ফেলবে ভেবে পাচ্ছে না। কেন যে চতুর্দলা করে উঠিয়ে আনতে গিয়েছিল! এখন যেন গলার কাঁটা হয়ে গেছে।

যাই হোক সমস্যার সমাধান করে দিল তার স্ত্রী ষষ্ঠী। দুলাল একদিন বলল- মা চলো তোমাকে বৃন্দাবন দর্শন করিয়ে আনি।
রাঙামাসি তো খুব খুশি। বাঁধা ছাঁদা করে দুদিন পরেই তারা দুই মায়ে-পোয়ে 'হরি - হরি'- বলে যাত্রা করল বৃন্দাবনের উদ্দেশ্যে। বৃন্দাবনে আসার দুদিন পর রাস পূর্ণিমা থাকায় প্রচুর লোকসমাগম হয়। আর সেই দিনই লোকের ভিড়ে রাঙামাসি যেন কেমন করে হারিয়ে যায়। অনেক খোঁজাখুঁজির পরেও দুলাল দা কে খুঁজে পায়না রাঙামাসি। আর তারপর থেকেই তিনি বৃন্দাবনে একলা সহায় সম্বলহীনা ভিখারিনীর মতো আছেন। এই পর্যন্ত শুনে করুণা বা আমি আমরা কেউ নিজেদের চোখের জল কে ধরে রাখতে পারলাম না।

দুলাল দার ফোন নম্বর জানা নেই রাঙামাসির, সেজন্য রাঙামাসির খবর জানতে আমি শঙ্খকে ফোন করলাম। সাধারণ কুশল বিনিময়ের পর জিজ্ঞাসা করলাম- হ্যাঁ রে, রাঙামাসির খবর জানি?

কিছুক্ষণ চুপ থেকে শঙ্খ ধরা গলায় বলে উঠলো - রাঙামাসি মারা গেছেন।
আমি তো স্থবির, বলে কি? জলজ্যান্ত মানুষটা আমার পাশেই দাঁড়িয়ে রয়েছেন আর বলে কিনা মারা গেছেন! আমিও কিছু প্রকাশ না করে জিজ্ঞেস করলাম- কবে? কিভাবে?

শঙ্খ বলল- কিভাবে তা সে ঠিক জানেনা, তবে বেশ কিছুদিন আগে দুলাল দা এসেছিল গলায় কাঁচা করে। খুব কেঁদে কেঁদে বললে- মাসি তীর্থ করতে মাকে বৃন্দাবনে ঘুরতে নিয়ে গেলাম, আর সেই যাওয়াই তার শেষ যাওয়া হল। সেখানে পৌঁছে ভেদ বমিতে তিনি মারা গেছেন। তবে মনে তার এই সান্তনা যে- বৃন্দাবন, তার উপরে পবিত্র যমুনার ধারের শ্মশানে তার মায়ের সৎকার করতে পেরেছে তাতেই তার মনে হয়েছে রাঙামাসির আত্মার স্বর্গোলাভ হয়েছে। এইসব কথা দুলালদার মুখে শুনে আমার ছোট মাসি খুব কান্নাকাটি করেছে তারপর দুলাল দার হাতে রাঙ্গা মাসির সেবার প্রতিদান স্বরূপ ৫০ হাজার টাকা দিয়ে বলেছিল ভালোভাবে শ্রাদ্ধশান্তি করতে। শ্রাদ্ধ শান্তি চুকে গেলে শঙ্খ একদিন গিয়েছিল দুলাল দার বাড়ি। এই পর্যন্ত শুনে নিয়ে আমি ফোন রেখে দিলাম। ভেবে পাচ্ছিলাম না কেন দুলালদা সবাইকে মিথ্যে কথা বলে তার জীবন্ত মায়ের শ্রাদ্ধ করল!

রাঙামাসি দুলাল দার কথা জিজ্ঞেস করলে বলকরলে- মাসি কি করবে ছেলে বউয়ের সংসারে ফিরে? সেই তো তুমি সেখানে ভালো ছিলে না। তার চেয়ে চলো না, মা -বাপ হারা এই ছেলে বউয়ের কাছে! দেখবে তুমি খুব ভালো থাকবে। আসল কথাটা চেপে গেলাম। করুনা কেও বললাম না। সেইদিন সন্ধ্যায় আমি করুণা আর রাঙামাসি, আমরা তিনজনই আমাদের দিল্লির বাসা বাড়িতে ফিরে এলাম।

করুণা ও খুব খুশি একজন সঙ্গী পেয়ে, আর আমিও খুশি মাতৃ সমা রাঙা মাসিকে পেয়ে।
বিয়ের পরে এই প্রথমবার আমরা লক্ষ্মী পূজা করব আমাদের ঘরে। সন্ধ্যের দিকে হঠাৎই করুণার শরীরটা একটু খারাপ লাগতে শুরু করে, আর ও মাথা ঘুরে পড়ে যায়। তড়িঘড়ি করে ওকে নিয়ে গেলাম কাছাকাছি একটি ডাক্তারখানায়। ডাক্তার বাবু করুণাকে চেক করেই আমাকে দিলেন খুশির খবর - আমাদের সংসারে নতুন অতিথি আসতে চলেছে, আমি বাবা হব।