আমার পুজো
চন্দ্রমা মুখার্জী,
সমর পল্লী, কলকাতা
আমার কাছে পুজো মানে এককথায় বাগবাজার সর্বজনীনের মাতৃমূর্তি। ছোটবেলায়
পুজোর ঠিক মুখেই থাকতো আমাদের স্কুলের ষাণ্মাসিক পরীক্ষা। প্রতিবছর তাই
পুজোর অনেক আগেই পুজোর নতুন জামা হয়ে যেতো। তারপর শুরু হত পরীক্ষা
প্রস্তুতি। আবার মহালয়াও পড়তো পরীক্ষার সময়েই। যদিও মহালয়ার দিন প্রায়
প্রতিবছরই ছুটি থাকতো। মহালয়ার দিন ভোর সাড়ে ৪টেয় ঠিক ঘুম ভেঙে যেত,
প্রথমে শুনতাম মহিষাসুরমর্দিনী। তারপর সাড়ে ৫টা বাজলেই উঠে পড়তাম ডিডি
বাংলায় মহালয়ার অনুষ্ঠান দেখবো বলে। বিখ্যাত নৃত্যশিল্পী সংযুক্তা
ব্যানার্জীকে দেবী দূর্গারূপে দেখার জন্য আমরা প্রতিবছর অধীর আগ্রহে
অপেক্ষা করতাম। এখনো জীবন্ত দেবী দূর্গা বললে ওঁনার মুখটাই মনে ভেসে
ওঠে।
আমাদের পরীক্ষা চলতো চতুর্থী অবধি। তারপর পরীক্ষা শেষে আমরা অত্যুৎসাহের
সাথে বাড়ি ফিরতাম। পঞ্চমীর দিন থেকে শুরু হতো ঠাকুর দেখা। নতুন জামা,
জুতো পরে বাবা – মায়ের হাত ধরে ঠাকুর দেখতাম। এইভাবে ষষ্ঠীও পেরিয়ে যেত।
তারপর সপ্তমীতে দুপুরবেলা চলে যেতাম আমার মামাবাড়ী। আর মামাবাড়ীর পাড়ার
পুজো হল বাগবাজার সর্বজনীন। এই ঐতিহ্যময় পুজোর মূল আকর্ষণই হল চিরন্তন
সাবেকী মাতৃমূর্তি। এছাড়া অষ্টমীতে লাঠিখেলার মাধ্যমে বীরাষ্টমী পালনও
বাগবাজারের আকর্ষণ।
ছোটবেলায় ঠাকুর দেখা মানেই বড়োরা জিজ্ঞাসা করতেন, ‘কিরে কটা ঠাকুর
দেখলি?’ দুবেলা নতুন – নতুন জামা পরে একেক দিকে ঠাকুর দেখতে যাওয়া হতো।
তবে ভিড়ে লাইন দিয়ে ঠাকুর দেখতে আমার কখনোই ভালো লাগেনা। তাই সকালে
বিকেলে ফাঁকায় ফাঁকায় ঠাকুর আমি এখনো দেখি। আবার কখনো ভোরবেলায় অন্ধকারে
ঠাকুর দেখতে বেরোনো হতো। তারও আলাদা একটা মজা ছিল।
তাছাড়া পুজো মানেই ভালো খাওয়াদাওয়া। অষ্টমীতে লুচি, ছোলার ডাল, নবমীতে
খাসির মাংস তো অবশ্যই থাকতে হবে। আর দশমীতে মিষ্টিমুখ। প্রতিদিনই ঠাকুর
দেখতে বেরিয়ে আইসক্রিম, ডাবের জল, ঠাণ্ডা মিষ্টি শরবত এরকম কিছু একটা তো
খেতেই হবে। হেঁটে হেঁটে ঠাকুর দেখার মজাই আলাদা। আর হাঁটতে হলে তো তেষ্টা
পাবেই। তাই এসব তো খেতেই হবে।
পাড়ায় পাড়ায় পুজোতেও ভালোই মজা হয়। দিনের বেলা পুজো, দুপুরে একসাথে
খাওয়াদাওয়া আর সন্ধ্যেবেলা আরতির পরে জলসা হয়। এরকমই দুবার পুজোয় পাড়া
থেকে সম্বর্ধনা দেওয়া হয়েছিল মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিকে পাড়ার সেরা হওয়ার
জন্য। এছাড়া প্রতি পাড়ার পুজোয় একটা সুভ্যেনির প্রকাশিত হয়, তাতেও
লেখালেখির শুরুতে লেখা দিতাম, সেগুলি ছাপার অক্ষরে দেখতে খুব ভালো
লাগতো।
পরবর্তীতে বিজয়ার পরে আমরা অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করতাম টিউশন ক্লাসের
জন্য। সেখানেও বিজয়ার খাওয়া মন্দ হতো না। মিষ্টি দিয়ে শুরু হলেও পেটুক
ছাত্র ছাত্রীদের বায়নায় শিক্ষকরা অনেক সময়ই রোল, বিরিয়ানি এইসব খাওয়াতে
বাধ্য হতেন। তাতে খাওয়ার চেয়ে বেশি মজা হতো।
আর যেটা না বললেই নয় সেটা হল শারদীয়া পূজাবার্ষিকী। আনন্দমেলা, শুকতারা,
কিশোর ভারতী প্রভৃতি বই কিনে বাড়ি ভরিয়ে ফেলতাম। পরীক্ষা শেষে পুজোর
ছুটিতে পড়তাম।
এখন আর সেইসব আনন্দের দিন নেই। তবে করোনার দুবছর বাদ দিয়ে প্রতিবছর
অবশ্যই বাগবাজার সর্বজনীনে মাকে দর্শন করে আসি। নাহলে পুজোটাই অসম্পূর্ণ
থেকে যায়। এখন আর পুজোবার্ষিকী কিনতে হয় না। নিজে লেখার সুবাদে প্রতিবছর
হাতে আসে সৌজন্য সংখ্যা। সেগুলি পড়েই দিব্যি দিন কেটে যায়। আর একদিন যাই
পুজোর সময়ের নতুন বাংলা সিনেমা দেখতে। আর খাওয়াদাওয়া তো একইরকম আছেই। এই
নিয়েই প্রতিবছর পুজো কেটে যাচ্ছে।