অবসরের ক্লান্তি

সুলেখা ভান্ডারী,

কসবা, বালিগঞ্জ

সন্ধ্যা উত্তীর্ণ প্রায়,
চারিদিক থেকে ভেসে আসা শঙ্খ ধ্বনি - ঘণ্টাধ্বনি
কানে এসে বাজে,
শুধু আমার হাত দুটো ঠাকুরের চরণ ছুঁতে-
আর এগিয়ে যায় না।
সকালে তাড়াহুড়ো করে কোনমতে ঘন্টা টা বাজিয়ে
জল আর ফুল দিয়ে চলে যায় মেয়েটা-
তার কর্মব্যস্ত জীবনের পথে।
আমি দূর থেকে শুধু শুনি,
প্রার্থনার শব্দও আজ কত দূরের মনে হয়!

জানালার ওপারে আমার প্রিয় ফুলগাছগুলো
প্রতিদিন যেন তাকিয়ে থাকে,
আর অভিমান ভরে বলে-
"মা, আমাদের কথা কি ভুলে গেলে?
তোমার স্নেহের স্পর্শ ছাড়া আমরাও যে বড় একা।"
কতদিন ওদের পাতায় হাত বুলিয়ে বলিনি,
"ভালো থেকো।" কতদিন নিজের হাতে জল দিইনি, পরিচর্যা করিনি ওদের,
কতদিন ফুটে ওঠা প্রথম ফুলটি ঠাকুরের চরনে রাখিনি।

রান্নাঘরের গ্যাস, দেয়ালের মলিন দাগ-ছোপ,
এলোমেলো সংসারের প্রতিটি কোণ
নীরবে আমায় ডেকে বলে-"তুমি কোথায়?"
আমি শুনি...কিন্তু উত্তর দিতে পারি না।

একদিন সময় ছিল না,
ঘড়ির কাঁটার সঙ্গে পাল্লা দিয়ে ছুটত জীবন।
আজ সময় থমকে দাঁড়িয়েছে,
তবু যেন কোথাও পৌঁছাতে পারি না।
একদিন এই সংসারই ছিল আমার সাধনা,
আমার ভালোবাসা, আমার অহংকার।
আজ সেই সংসারেই আমি যেন নীরব অতিথি।

থিয়েটারের আলো - ফাংশনের মঞ্চ ডাকে,
কত আমন্ত্রণপত্র আসে,
মাইক্রোফোনের সামনে আবৃত্তি পাঠ করার জন্য -
গলাটা বারবার খুসখুস করে ওঠে,
ব্যায়াম ক্লাসের স্যার আর বন্ধুদের হাসিমুখগুলো ডাকে,
আর আমার লেখার টেবিলে সাদা কাগজগুলো-
নিঃশব্দে অপেক্ষা করে।

কত গল্প যে প্রতিদিন হৃদয়ের দরজায় কড়া নাড়ে!
কত কবিতা চোখের জলে ভিজে ফিরে যায়-
অক্ষর না হয়েই!
কলমটা এখনও আছে, কালিটাও শুকিয়ে যায়নি-
শুধু লিখে চলা হাত দুটোই আজ বড় ক্লান্ত।

ছোট্ট নাতিটাকে বুকের মধ্যে জড়িয়ে ধরতে ইচ্ছে করে,
ডাক্তারি নিষেধের দেয়াল আমার দু'হাত আটকে দেয়।
আর যখন চার বছরের বড় নাতিটা আদোর করে
দু'হাত দিয়ে আমার গাল ছুঁয়ে বলে-
"দিদুন, তুমি ভালো হয়ে যাবে..."
তখন বুকের ভেতর অঝোর বৃষ্টি নামে।
নোনা ধারার দুটো স্রোত মুখ বুক ভাসিয়ে দিয়ে যায়।

আমি বিছানায় বসে ঈশ্বরকে ডাকি-
হে ঈশ্বর, আর কতদিন?
একদিন সংসারের কাজ করতে করতে ক্লান্ত শরীরটা
বিশ্রামের জন্য কত আকুল প্রার্থনা করেছে!
আর আজ সেই বিশ্রামই আমার সবচেয়ে বড় ক্লান্তি,-
আমার শৃঙ্খল।
সময় আছে, কিন্তু কাজ নেই।
স্বপ্ন আছে, কিন্তু শক্তি নেই।
শব্দ আছে, কিন্তু অক্ষর নেই।
জীবন আছে, তবু যেন বেঁচে থাকার সবচেয়ে-
প্রিয় কারণগুলো এক এক করে হারিয়ে যাচ্ছে।

হে পরমেশ্বর, অলৌকিক সুখ চাই না,
ফিরিয়ে দাও শুধু আমার সেই সাধারণ দিনগুলো।
আবার ভোরে নিজের হাতে ফুল তুলব,
সন্ধ্যায় ঠাকুরঘরে প্রদীপ জ্বালাব, শাঁখ বাজাব।
বারান্দার গাছেদের সঙ্গে গল্প করব,
প্রিয় মানুষগুলোর জন্য নিজের হাতে রান্না করব।
আর যদি কিছু দিতেই চাও,
তবে ফিরিয়ে দাও আমার কলমের শক্তিটুকু।

কারণ একজন লেখকের সবচেয়ে বড় অসুখ শরীরে নয়-
অসুখ তখনই- যখন তার হৃদয় ভরে ওঠে, অথচ-
সেই হৃদয়ের ভাষা কাগজে নেমে আসতে পারে না।
সেদিনই নিঃশব্দে কেঁদে ওঠে তার প্রতিটি অপ্রকাশিত শব্দ।
আর সেই কান্না- পৃথিবীর কোনো শব্দেই শোনা যায় না...

তবু জানি -
অন্ধকারেরও শেষ আছে,
একদিন আবার ঠিক সময়ে
ঠাকুর ঘরের প্রদীপ টা জ্বলবে আমার হাতে,
শঙ্খ বাজবে, ধূপ ধুনোর গন্ধে ভরে উঠবে আমার ঘর,
অন্তরের ভক্তি উজাড় করে সাজাবো ঠাকুরের সিংহাসন।
আমার স্নেহের স্পর্শে ফুলেরা আবারও হাসবে,
রান্নাঘর ভরে উঠবে মন পছন্দ খাবারের গন্ধে,
আর আমি বলব-"আমি ফিরে এসেছি, তোমাদের মাঝে,
ফিরে এসেছি- জীবনের কাছে।"