আম গাছের আত্মকথা

রাকা নাথ,

কলকাতা

পলাশপুর গ্রামের এক কোণে ছিল একটি বড়ো সুন্দর বাড়ি। বাড়িটির বিশাল উঠোনে একদিন আট-নয় বছরের ছোট্ট মেয়ে শ্রেষ্ঠা একটি ছোট্ট আমগাছের চারা লাগিয়েছিল। দু’হাত দিয়ে মাটি চাপা দিয়ে সে বলেছিল,#- “তুই কিন্তু বড়ো হয়ে অনেক আম দিবি, বুঝলি!”

সেদিন থেকেই শুরু হয়েছিল আমার নতুন জীবন। হ্যাঁ, আমি সেই আমগাছ। ছোট্ট শ্রেষ্ঠা ছিল আমার সবচেয়ে আপন মানুষ। প্রতিদিন সকালে সে আমার কাছে আসতো, জল দিত, আগাছা পরিষ্কার করতো আর মিষ্টি গলায় গল্প করতো। কখনও বলতো স্কুলের কথা, কখনও তার বন্ধুদের কথা। আমি যেন ওর নীরব বন্ধু হয়ে উঠেছিলাম।

দিন যেতে লাগলো। আমিও ধীরে ধীরে বড়ো হতে লাগলাম। আমার ডালে এসে বসতো দোয়েল, শালিক, কোকিল। তারা সারাদিন কিচিরমিচির করে গান গাইতো। গ্রামের হাওয়ায় দুলতে দুলতে আমার খুব আনন্দ হতো। মনে হতো, এই পৃথিবীতে আমার থেকেও সুখী কেউ নেই।

কিন্তু হঠাৎ একদিন সবকিছু বদলে গেল।

সকালে ঘুম ভেঙে দেখি বাড়ির দরজায় তালা ঝুলছে। চারদিক নিস্তব্ধ। শ্রেষ্ঠা নেই, তার মা-বাবাও নেই। আমি অবাক হয়ে অপেক্ষা করতে লাগলাম। ভাবলাম, হয়তো একটু পরেই সবাই ফিরে আসবে। কিন্তু দিন গেল, সপ্তাহ গেল, কেউ এল না।

গরমের রোদে আমার পাতা শুকিয়ে যেতে লাগলো। তৃষ্ণায় আমার বুক ফেটে যাচ্ছিল। আমি মনে মনে বললাম,#- “শ্রেষ্ঠা, তুই কোথায়? আমাকে একটু জল দিবি না?”

এদিকে কলকাতায় বসেও শ্রেষ্ঠার মন পড়ে ছিল পলাশপুরের বাড়িতে। একদিন সে মাকে জিজ্ঞেস করলো,# - “মা, আমরা গ্রামের বাড়িতে কবে যাবো? আমার আমগাছটার জন্য খুব মন খারাপ করছে। কতদিন ও জল পায়নি!”

মা স্নেহভরে বললেন,#- “যাবো মা, খুব তাড়াতাড়ি যাবো। তোর বাবার ছুটি হলেই যাবো।”

ঠিক তখনই বাবা বললেন,#- “এবার গেলে ভাবছি গাছটা কেটে দেবো। বাড়িতে তো কেউ থাকে না, যত্নও হয় না।”

শ্রেষ্ঠা সঙ্গে সঙ্গে চিৎকার করে উঠলো,# — “না বাবা! ওকে কাটবে না। আমি কত কষ্ট করে গাছটা লাগিয়েছি! দরকার হলে একজন মালি রাখো। আর শুধু এই গাছ নয়, পুরো উঠোনে আরও অনেক গাছ লাগাই। তাহলে বাড়িটা আবার সুন্দর হয়ে উঠবে।”

মা মৃদু হেসে বললেন,#- “মেয়েটা কিন্তু একদম ঠিক কথাই বলেছে।”

বাবাও শেষ পর্যন্ত রাজি হয়ে গেলেন।

কয়েকদিন পর এক সকালে সবাই মিলে পলাশপুরের বাড়িতে ফিরলো। শ্রেষ্ঠা ঘরে ব্যাগ রেখেই দৌড়ে আমার কাছে চলে এলো। আমাকে দেখে তার চোখ ভিজে উঠলো। শুকিয়ে যাওয়া পাতাগুলো দেখে সে বললো,#- “ইস! তোর কী অবস্থা হয়েছে!”

তারপর বালতি ভর্তি জল এনে আমার গোড়ায় ঢালতে লাগলো। ঠান্ডা জলের স্পর্শে যেন আমি নতুন জীবন ফিরে পেলাম। মনে হলো, এতদিনের কষ্ট এক মুহূর্তে দূর হয়ে গেছে।

জল দিতে দিতে শ্রেষ্ঠা হাসিমুখে বললো,#- “ভয় নেই বন্ধু, তোর একা থাকার দিন শেষ। বাবা এখানে আরও অনেক গাছ লাগাবে, আর একজন মালি রাখবে তোদের যত্ন নেওয়ার জন্য।”

সেদিন হাওয়ায় দুলতে দুলতে আমার খুব আনন্দ হচ্ছিল। মনে হচ্ছিল, আমি শুধু একটি গাছ নই, আমি শ্রেষ্ঠার ভালোবাসার অংশ। সেই ভালোবাসাই আমাকে নতুন করে বাঁচিয়ে দিল।